মুমিনের গুনাবলী

বর্তমান সময়ে আল্লাহ পাক আমাদেরকে সুস্থ রাখার জন্য আমরা আল্লাহর কাছে হাজারো শুকরিয়া জানাই, আলহামদুলিল্লাহ। আমাদের উচিত সর্বদা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করা। আজ আমি একজন মুমিনের কিছু বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে মুমিনের গুনাবলী সমূহ আলোকপাত করব। মুমিন সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর একত্ববাদে আন্তরিকতার সাথে বিশ্বাস করে এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলে এবং সে অনুযায়ী জীবনযাপন করে। আল্লাহ বলেন, প্রকৃত ঈমানদার তারাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে নিয়ে মনের মধ্যে কোন প্রকার সন্দেহ পোষন করে না এবং যারা আল্লাহর পথে নিজেদের জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করে তারাই সত্যবাদী। ‘ (সূরা হুজরাত : আয়াত ১৫)

মুমিনের গুনাবলী

 

মুমিনের গুণাবলী

আল্লাহ তায়ালা তাঁর সকল বান্দাকেই ভালবাসেন। আল্লাহর রহমত সকল বান্দার উপরই অশেষ। কিন্তু কিছু বান্দার জন্য আল্লাহর রহমত ও ভালোবাসা একটু বেশি। ভক্তিমূলক কাজ, অধিক সংখ্যক উপাসনামূলক কাজ এবং নৈকট্য অর্জনের বিভিন্ন প্রচেষ্টা আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার মাধ্যম। বিশ্বাসীরা আল্লাহর এই বিশেষ ভালবাসার জন্য আল্লাহর প্রশংসা করতে পারে। নিচে এ বিষয়ে অর্থাৎ মুমিনের গুনাবলী সমূহ আলোচনা করা হলো-

মুহাম্মদ (সঃ) এর প্রতি ভালোবাসা

মুমিনমাত্রই নবীজি (সা.)-কে ভালোবাসা আবশ্যক। নবীর প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা ছাড়া প্রকৃত মুমিন হওয়া অসম্ভব। তাই নবীর সুন্নাহ যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমে নবীকে ভালোবাসতে পারলে আল্লাহর ভালোবাসা অনুভব করা যায়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও, তবে আমাকে অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১)

 

নফল ইবাদতে মনোযোগী হওয়া

ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করা যায়। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ বলেন, আমি আমার বান্দার উপর যা ফরয করেছি, তা দ্বারা কেউ আমার নিকটবর্তী হবে না। আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকবে। এমনকি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্র বানিয়ে নিই যে আমিই তার কান হয়ে যাই (রূপক অর্থে), যা দিয়ে সে শুনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, তাহলে আমি নিশ্চয়ই তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তাহলে অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দিই। আমি কোনো কাজ করতে চাইলে তা করতে কোনো দ্বিধা করি না, যতটা দ্বিধা করি মুমিন বান্দার প্রাণ নিতে। সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে আর আমি তার বেঁচে থাকাকে অপছন্দ করি। (বুখারি, হাদিস : ৬৫০২)

 

ইসলামী বিধান পালনে কঠোর হওয়া

ইসলামের সকল বিধি-বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং যত্নশীল হওয়াই আল্লাহর প্রিয় হওয়ার উপায়। কোনো বিধানের প্রতি কোনো অবিশ্বাস ও শিথিল মনোভাব বজায় রাখা যাবে না। যে কেউ আল্লাহর কোনো বিধানকে অবজ্ঞা করে সে তার বিশেষ ভালোবাসা থেকেও বঞ্চিত হয় এবং ঈমান থেকেও বঞ্চিত হয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমাদের মধ্যে যে তার ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, আল্লাহ শীঘ্রই একটি সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন যাদেরকে তিনি ভালোবাসবেন এবং তারা তাকে ভালোবাসবে। তারা মুসলমানদের প্রতি নম্র এবং কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে। তারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করবে এবং নিন্দুকের তিরস্কারকে ভয় পাবে না। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যদাতা, প্রজ্ঞাময়। (সূরা: মায়েদা, আয়াত: ৫৪)

 

আল্লাহর জন্য পারস্পরিক সুসম্পর্ক রাখা

আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমেও আল্লাহর প্রিয় হওয়া যায়। আল্লাহর প্রেমই আখেরাতের প্রধান চিন্তা। যারা এ ধরনের পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন করে তারা আল্লাহর কাছে প্রিয় হয়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ বলেন, যারা আমার (সন্তুষ্টির) জন্য একে অপরকে ভালোবাসে তাদের জন্য আমার ভালোবাসা ওয়াজিব। আমার জন্য একসাথে বসে থাকা, আমার জন্য একে অপরের সাথে দেখা করা এবং আমার জন্য একে অপরের জন্য ব্যয় করা। (মুওয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদিস: ১৭২১)

 

দুঃখ-দুর্দশায় আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা

আল্লাহ বিশ্বাসীদের বিভিন্ন উপায়ে পরীক্ষা করেন। এটা বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহর ভালবাসার একটি বহিঃপ্রকাশ। ধৈর্যের মাধ্যমে এসব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে মুমিন আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় হয়ে ওঠে। আনাস বিন মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী করীম (সঃ) বলেছেন, ‘বিপদ যত বেশি কঠিন, সওয়াব তত বেশি। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন জাতিকে পরীক্ষা করেন যখন তারা তাকে ভালোবাসে। যে এতে সন্তুষ্ট হয় আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হন। আর যারা এতে অসন্তুষ্ট তাদের জন্য অতৃপ্তি তো আছেই। (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪০৩১)

 

দুনিয়ার মোহ থেকে বেঁচে থাকা

জগতের মোহই সকল অনিষ্টের মূল। দুনিয়ার মোহই দুর্নীতি-দুর্নীতিসহ সামাজিক বিশৃঙ্খলার মূল কারণ। দুনিয়ার প্রতি প্রবল আকর্ষণ থাকলে বুঝতে হবে সে ধীরে ধীরে আল্লাহর ভালোবাসা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কাতাদা ইবনু নুমান (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তাকে দুনিয়া (প্রাচুর্য) থেকে রক্ষা করেন, যেমন তোমাদের কেউ তার রোগীকে পানি থেকে রক্ষা করে। (তিরমিযী, হাদীসঃ ২০৩৭)। )

আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভের ব্যাকুলতা

একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে কাঙ্খিত বিষয় হল আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করা। আল্লাহ তায়ালা সেই মুমিনকে ভালোবাসেন যে আল্লাহর সাক্ষাতের অপেক্ষায় থাকে। মানুষের অন্তরে আল্লাহকে দেখার আকাঙ্ক্ষা যত বেশি হবে, সে তত বেশি আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করতে পারবে। আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে ভালোবাসে, আল্লাহও তার সাক্ষাৎ পছন্দ করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করতে ভালোবাসে না, আল্লাহও তার সাক্ষাৎ পছন্দ করেন না। (বুখারি, হাদিস : ৬৫০৮)

 

পারস্পরিক আন্তরিকতা ও হৃদ্যতা

শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পারস্পরিক ভালবাসা ও ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ক তৈরি করাই একজন মুমিনের অনন্য বৈশিষ্ট্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন সবার কাছাকাছি, অন্তরঙ্গ। যারা অন্তরঙ্গ নয় এবং যাদের সাথে ঘনিষ্ঠ হতে পারে না তাদের মধ্যে কোন কল্যাণ নেই। (মুসনাদে আহমাদ)

 

 

সৌজন্যমূলক আচরণ

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজের বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে মিশতে হবে। মানুষের সাথে কিভাবে আচরণ করা যায়? একটি হাদিসে বলা হয়েছে, “যে মুসলমান মানুষের সাথে মেলামেশা করে এবং তাদের দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য্য ধারণ করে, সে এমন মুসলমানের চেয়ে উত্তম যে মানুষের সাথে মেলামেশা করে না এবং তাদের কষ্ট সহ্য করে না।” (তিরমিযী শরীফ)

 

 

মুমিনের মানসিক শক্তি

নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘একজন শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে আল্লাহর কাছে উত্তম এবং অধিক পছন্দনীয়। তবে তোমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে, যাতে তোমরা চেষ্টা কর যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও। অক্ষম হয়ো না…’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৬৬৭)

 

 

মুমিন সহজ-সরল

একটি হাদিসে আল্লাহর রাসূল (সা.) একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘একজন মুমিন চিন্তাশীল, গম্ভীর ও ভদ্র। আর পাপী লোকেরা প্রতারক, প্রতারক, কৃপণ, নিকৃষ্ট এবং অভদ্র। (তিরমিযী, হাদিস: ১৯৬৪)

 

 

মুমিনের দাম্পত্য জীবন

স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের প্রতি আন্তরিকতা ও ভালোবাসা আল্লাহর দেওয়া এক অপূর্ব নেয়ামত। তাই কোন বিশ্বাসী দম্পতি একে অপরকে ঘৃণা করতে পারে না; বরং কারো ভুল হলে একে অপরের সমাধানে এগিয়ে আসে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি হাদিসে বলেছেন, ‘কোন মুমিন পুরুষ কোনো মুমিন নারীর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে না; কারণ তার কোনো চরিত্র-অভ্যাস যদি সে অপছন্দ করে তবে তার অন্য কোনো চরিত্র-অভ্যাস সে পছন্দ করবে। (মুসলিম, হাদিস : ৩৫৪০)

 

 

মুমিনের ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা

মুমিনের গুনাবলী এর মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সংসার জীবনে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা সবার জীবনেই আসে। কিন্তু এই দুঃখ ও সুখের মাধ্যমেও আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের অবস্থা বিস্ময়কর। সব কাজই তার জন্য ভালো। মুমিন ব্যতীত অন্য কারো এই বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে না। যখন তারা সুখ ও শান্তি লাভ করে, তারা শোক করে, এবং যখন তাদের উপর দুঃখ বা দুর্ভাগ্য আসে তখন তারা ধৈর্য ধারণ করে। তাদের জন্য সবকিছুই ভালো। ‘

 

 

মুমিনের কোরআন তেলাওয়াত

নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করে তার উদাহরণ লেবুর মতো যা সুস্বাদু ও সুগন্ধযুক্ত। আর যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করে না তার উদাহরণ হল একটি খেজুরের মত যা সুগন্ধহীন কিন্তু খেতে সুস্বাদু। আর কোরআন পাঠকারী পাপীর উদাহরণ রায়হান জাতীয় লতার মতো, যার সুগন্ধ আছে কিন্তু খেতে বিস্বাদ। আর যে গুনাহগার কোরআন তেলাওয়াত করে না তার উদাহরণ মাকাল ফলের মতো, যা খেতে বিস্বাদ এবং কোনো সুগন্ধি নেই। (বুখারি, হাদিস : ৫০২০)

 

 

মুমিন অন্যায়ের প্রতিবাদ করে

বিশ্বাসীরা কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে না। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ অন্যায় হতে দেখে, তখন সে যেন হাত দিয়ে তা বন্ধ করে দেয়। আর তা সম্ভব না হলে বিবাদী ভাষা দিয়ে তা প্রতিহত করে। আর যদি সে তা না করে, তাহলে সে যেন মনেপ্রাণে সেই মন্দ কাজ বন্ধ করার পরিকল্পনা করে (মনে ঘৃণা করে), এটা দুর্বল ঈমানের লক্ষণ। (তিরমিযী, হাদিস : ২১৭২)

 

 

মুমিন যা চায় তা করে না

আল্লাহর প্রিয় মুমিনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তারা দুনিয়াকে নিজেদের মনে করে না; বরং একটু সময় নিয়ে ভাবুন পজিশন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, “দুনিয়া মুমিনের কারাগার এবং কাফেরদের জান্নাত”। (মুসলিম, হাদিস: ২৯৫৬)

 

উক্ত আলোচনায় আমরা মুমিনের গুনাবলী সম্পর্কে যে বিষয় সমূহ আলোচনা করেছি প্রত্যেকটি পয়েন্টই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে প্রকৃত মুমিন হওয়ার ও মুমিনের গুনাবলী সমূহ যথাযথ ভাবে পালনের মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয়পাত্র হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমিন।।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x
error: Content is protected !!