শাওয়াল মাসের রোজা

‘শাওয়াল’ অর্থ উন্নত করা, উন্নতি করা; উন্নত জমি; পরিপূর্ণতা, ফলপ্রসূতা, পাল্লা ভারী হওয়া, গৌরব করা, বিজয়ী হওয়া; প্রার্থনায় হস্ত উত্তোলন করা বা ভিক্ষায় হস্ত প্রসারিত করা; পাত্রে অবশিষ্ট সামান্য পানি; ফুরফুরে ভাব, দায়ভারমুক্ত ব্যক্তি; ক্রোধ প্রশমন ও নীরবতা পালন; সিজন করা শুকনা কাঠ। এই প্রতিটি অর্থের সাথে শাওয়ালের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই মাসের সময়কাল দ্বারা সমৃদ্ধি লাভ হয়; পরিপূর্ণতা ফলপ্রসূ হয়; নেকির পাল্লা ভারী; গৌরব অর্জিত হয় এবং সাফল্য আসে; অন্বেষণকারী হাত প্রসারিত করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে; পূর্ণ মাস রোজা রাখার পর আরও কয়েকটি রোজা রাখা; সে প্রাপ্তিতে আনন্দিত হয়; ফরজ রোজা পালনের পর নফল রোজায় মনোযোগ দিন; আত্ম-নিয়ন্ত্রণের শক্তি অর্জন করে; পরিপক্কতা এবং মর্যাদা লাভ করে। এগুলো হল শাওয়াল মাসের নামের সঠিকতা। আল্লাহ তাআলা কোরআন মাজিদে বলেন, ‘যখন তুমি (ফরজ) দায়িত্ব সম্পন্ন করবে তখন উঠে দাঁড়াবে এবং তুমি (নফলের মাধ্যমে) তোমার রবের প্রতি অনুরাগী হবে।’ (সুরা-৯৪ ইনশিরা, আয়াত: ৭-৮)।

শাওয়াল মাসের রোজা

 

শাওয়াল মাসের রোজা

ইসলামী মাসগুলোর মধ্যে শাওয়াল মাস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাস। এ মাসের অনেক তাৎপর্য রয়েছে। শাওয়াল আরবি চন্দ্র বছরের দশম মাস। এটি হজের তিন মাসের (শাওয়াল, জিলকদ, জিলহজ) অগ্রদূত। এ মাসের প্রথম দিন ঈদুল ফিতর বা রমজানের ঈদ। পহেলা শাওয়ালে সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা আদায় করা এবং ঈদের নামাজ পড়া ওয়াজিব। এ মাসের সঙ্গে হজের সম্পর্ক, ঈদের সঙ্গে যুক্ত; এটি রোজা ও রমজানের সাথে সম্পর্কিত এবং এর সাথে দান ও যাকাত সম্পর্কিত। তৃতীয় হিজরি সনের এই মাসের ৭ তারিখে (২৩ মার্চ, ৬২৫ খ্রিস্টাব্দ) ওহুদের যুদ্ধে বিজয়ী হয়। এ মাসটি খুবই উর্বর এবং আমল ও ইবাদতের জন্য উপযোগী।

শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখা সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘যারা রমজানের রোজা রাখে এবং শাওয়াল মাসে আরও ছয়টি রোজা রাখে; যেন তারা সারা বছর রোজা রাখে।’ (মুসলিম: ১১৬৪; আবু দাউদ: ২৪৩৩; তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, সহীহ-আলবানী)। একটি বছর চন্দ্র মাস হিসাবে তিনশত চুয়ান্ন বা তিনশত পঞ্চান্ন দিন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রতিটি নেক কাজের প্রতিদান কমপক্ষে ১০ গুণ দেন। (সূরা-৬ আনাম, আয়াত: ১৬০)। এই হিসাবে রমজান মাসের ১০ গুণ সমান তিনশ দিনের সমান। বাকি চুয়ান্ন বা পঞ্চান্ন দিনের জন্য আরও ছয়টি পূর্ণ রোজা প্রয়োজন।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আরও বলেন, ‘আল্লাহ শাওয়াল মাসের ছয় দিনে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি এই মাসে ছয় দিন রোজা রাখবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে প্রত্যেক সৃষ্ট জীবের সংখ্যার সমান নেক আমল দান করবেন, সমপরিমাণ পাপ মোচন করবেন এবং পরকালে তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করবেন।’

শাওয়াল মাসের যে কোনো সময় এ রোজা রাখা যায়। ধারাবাহিকভাবে বা মাঝে মধ্যে বিরতি দিয়েও আদায় করা যায়। উল্লেখ্য যে, রমজান মাসের ফরজ রোজা ব্যতীত অন্য সব রোজা সাহরির সময়ের মধ্যেই করতে হবে। যদি এই দিন ঘুমানোর আগে বা তার আগেও রোজা রাখার দৃঢ় সংকল্প থাকে, তাহলে নতুন নিয়ত সহীহ হবে না এবং সাহরি খেতে না পারলেও রোজা হবে। (ফাতাওয়া শামী)।

রমজানের রোযার কাজা পরবর্তী রমজান মাস আসার আগে যে কোন সময় করা যায়। রমজানের কাযা রোজা রাখার সময় খুব কম হলে তার আগে নফল রোজা রাখা জায়েয ও বিশুদ্ধ। তাই ফরজ রোজা রাখার আগে নফল রোজা রাখতে পারেন। তবে সম্ভব হলে আগে ফরজ রোজা আদায় করা উত্তম। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১৬৬)। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমার ওপর রমজানের যে কাজা রোজা বাকি থাকত; তা পরবর্তী শাবান ব্যতীত আমি আদায় করতে পারতাম না।’ (বুখারি: ১৯৫০; মুসলিম: ১১৪৬)।

 

হাদিসে শাওয়াল মাসে বিয়েশাদি সুন্নাত, যেরূপ শুক্রবারে ও জামে মসজিদে ও বড় মজলিশে আকদ অনুষ্ঠিত হওয়া সুন্নাত। কারণ মা আয়েশার বিয়ে হয়েছিল শাওয়াল মাসের শুক্রবার মসজিদে নববীতে। (মুসলিম)। এই মাসটি শুভ সূচনার জন্য খুবই উপকারী। এ মাসে বিভিন্ন ইসলামী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মবর্ষ শুরু করে। ইসলামি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো চলতি মাসে তাদের নতুন শিক্ষাবর্ষের ভর্তি ও নতুন ক্লাস শুরু করেছে।

শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখাও রমজানের রোজা কবুল হওয়ার পরিচায়ক। আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো বান্দার আমল কবুল করেন, তখন তিনি তাকে অনুরূপ আরও আমল করার তাওফিক দেন। ভালো কাজের পুরস্কারের একটি রূপ হল আবার আরও ভালো কাজ করার সৌভাগ্য অর্জন করা। তাই বাকি ১১ মাসও নামাজ, রোজা, তেলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদত বজায় রাখতে হবে।

 

শাওয়াল মাসের ছয়টি রোযার ফজিলত

রমজান মাসের পরের মাস অর্থাৎ হিজরি বছরের দশম মাস হল শাওয়াল মাস। মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় জাতীয় উৎসব ঈদ-উল-ফিতর এ মাসের প্রথম দিনে উদযাপিত হয়। মুসলমানরা যাতে উৎসবের আনন্দে রমজানের মহান শিক্ষা ভুলে না যায়, সেজন্য মহানবী (সা.) এ মাসে ছয়টি নফল রোজা পালনে উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন।

হজরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা.) একটি হাদিস বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসের সকল ফরজ রোযা রাখল এবং তারপর শাওয়াল মাসে আরো ছয়টি রোযা রাখল, সে যেন সারা বছর রোযা রাখল। (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৪)

আলোচ্য হাদিসে যে বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয় তা হলো, শাওয়াল মাসে মাত্র ছয়টি রোজা রাখলে এক বছরের নফল রোযার সওয়াব পাওয়া যাবে না। আবার কোথাও উল্লেখ নেই যে, মহিমান্বিত রমজানে পুরো এক মাস রোজা রাখলেও এক বছরের নফল রোজার সওয়াব পাওয়া যাবে। বরং পুরো রমজান মাস রোজা রাখার পর শাওয়াল মাসে আরও ছয়টি রোজা রাখলেই কেবল পুরো এক বছর রোজা রাখার সওয়াব পাওয়া যাবে, হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন।

আসলে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের বক্তব্য হাদিসে এসেছে। বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি একটি নেক আমল করবে তাকে দশগুণ সওয়াব দেওয়া হবে। ‘ (সূরা আল-আনআম: ১৬০) সুতরাং রমজান মাসের ১০ বার হল দশ মাস এবং শাওয়াল মাসের দশ বার ছয় দিন হল ৬০ দিন অর্থাৎ দুই মাস।

অর্থাৎ পূর্ণ এক বছরের নফল রোযার সওয়াব লাভের জন্য রমজানের রোজা রাখার পর শাওয়ালের ছয় মাস রোজা রাখার শর্ত থাকলেও কেউ কোনো কারণে পূর্ণ রমজান মাস রাখতে না পারলে এমন নয় যে শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখা যাবে না। সেক্ষেত্রে পুরো এক বছরের নফল রোজার সওয়াব না পেলেও নফল রোজার সীমাহীন নেকী যে পাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

আল্লাহ আমাদের সকলকে শাওয়াল মাসের রোজা রাখার তৈফিক দান করুন। আমিন।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x
error: Content is protected !!