তালাক

দাম্পত্য জীবন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অনেক বড় ও বিশেষ একটি নেয়ামত। স্বামী-স্ত্রী সকলের কর্তব্য, এই নেয়ামতের যথাযথ মূল্যায়ন করা এবং একে অপরের সকল অধিকার আদায় করা। স্ত্রীর জন্য উচিত নয়, কথায় কথায় স্বামীর কাছে তালাক চাওয়া। আবার স্বামীর জন্যও জায়েয নয় আল্লাহ তাআলার দেওয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করা। যে সকল কারণে দাম্পত্য সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়, সেগুলো দূর করার জন্য কোরআন-হাদিসে অনেক নির্দেশনা রয়েছে। যেমন-

১। বিবাহের আগে একে-অন্যকে ভালোভাবে দেখে নেবে, যাতে বুঝে-শুনে বিবাহ সম্পন্ন হয় এবং কোনো ধরনের দৈহিক ত্রুটির কারণেই যেন সম্পর্ক ছিন্ন করার উপক্রম না হয়।

২। শুধু একে অপরের দোষ-ত্রুটির দিকেই দেখবে না, বরং তার মধ্যে যেসব ভালো গুণ বিদ্যমান, সেগুলোর দিকে তাকিয়ে অপছন্দের দিকগুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবে। আর যদি পরিস্থিতি এমন হয়ে যায় যে মীমাংসা ও সংশোধনের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। কোনোক্রমেই একসঙ্গে থাকা সম্ভব না হয়, এমন পরিস্থিতিতে অন্য কোনো পথ খোলা না থাকলে শরিয়ত সমর্থিত পদ্ধতিতে তালাক দেবে।

তালাক দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি

কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসারে তালাক দেওয়ার সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো, স্ত্রী যখন হায়েজ (মাসিক) থেকে পবিত্র হবে, তখন স্বামী তার সঙ্গে সহবাস না করে সুস্পষ্ট শব্দে এক তালাক দেবে। যেমন—আমি তোমাকে এক তালাক দিলাম। এরপর স্বামী যদি স্ত্রীকে ইদ্দত চলাকালীন ফিরিয়ে নিতে চায়, তাহলে তা পারবে। পুনরায় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কায়েম হয়ে যাবে। অন্যথায় ইদ্দত শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং স্ত্রী স্বামী থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যাবে। তখন স্ত্রী ইচ্ছা করলে অন্যত্র বিবাহ করতে পারবে। তালাক দিতে একান্ত বাধ্য হলে এই পদ্ধতিতে তালাক দেওয়া কর্তব্য।

শরিয়ত নির্দেশিত পদ্ধতিতে তালাক দেওয়ার সুফল : বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, তালাকের পরে দাম্পত্যজীবনের সুখ-শান্তির কথা মনে পড়ে পরস্পরের গুণ ও অবদান স্মরণ করে উভয়েই অনুতপ্ত হয় এবং বৈবাহিক সম্পর্ক পুনর্বহাল করার আপ্রাণ চেষ্টা করে। যদি শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী এক তালাক দেওয়া হয়, তাহলে এ আশা পূরণ হওয়ার সুযোগ থাকে এবং পুনরায় বৈবাহিক জীবন শুরু করতে পারে। এ পদ্ধতিতে দীর্ঘ সময় স্ত্রীকে পুনঃগ্রহণের অবকাশ পাওয়া যায় এবং তালাকের কারণে সৃষ্ট সমস্যা নিয়েও ভাবার সুযোগ থাকে। আর যদি ইদ্দত শেষ হয়ে বিচ্ছেদের পর আবার তারা দাম্পত্যজীবনে ফিরে আসতে চায়, তাহলে নতুন মোহরানা ধার্য করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। এ ক্ষেত্রে অন্যত্র বিবাহের প্রয়োজন হবে না। দুর্ভাগ্যবশত, দ্বিতীয়বারও তাদের মাঝে বনিবনা না হলে এবং পুনরায় তালাকের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সে ক্ষেত্রেও ইসলামের নির্দেশনার পূর্ণ অনুসরণ করে ওই সুবিধা ভোগ করতে পারবে।

উল্লেখ্য, তালাকের সময় স্ত্রী গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত তার ইদ্দতের সময়। আর গর্ভবতী না হলে তিন হায়েজ (মাসিক) অতিক্রম হওয়া পর্যন্ত।

তবে স্বামী যেহেতু স্ত্রীকে দুই ধাপে দুই তালাক প্রদান করেছে, তাই এখন শুধু একটি তালাক তার অধিকারে আছে। এই তৃতীয় তালাক প্রদান করলে আর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না এবং পুনরায় বিবাহও করতে পারবে না। কেননা এই সুযোগ দুই তালাক পর্যন্তই সীমিত। যে ব্যক্তি উপরোক্ত পদ্ধতিতে দুই তালাক দেওয়ার পর পুনরায় বৈবাহিক সম্পর্ক কায়েম করবে, তাকে আগামী দিনগুলোতে খুব হিসাব-নিকাশ করে চলতে হবে। একটু অসতর্কতার কারণে তৃতীয় তালাক দিয়ে ফেললে আর এই স্ত্রীকে নিয়ে ঘর-সংসার করার সুযোগ থাকবে না; বরং সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যাবে।

তালাক

 

ইসলামের নির্দেশনা অমান্য করার কুফল

এভাবেই ইসলামী শরিয়ত বৈবাহিক সম্পর্ক অটুট রাখার অবকাশ দিয়েছে। কিন্তু মানুষ শরিয়তের এই সুন্দর পদ্ধতি উপেক্ষা করে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সব শ্রেণির লোকদের মধ্যেই এ প্রবণতা দেখা যায় যে তারা যখন রাগে-ক্ষোভে লিখিত বা মৌখিকভাবে তালাক দেয় তখন একসঙ্গে তিন তালাকই দিয়ে থাকে। তিন তালাক দিলে ইদ্দত চলাকালীনও স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে না এবং ইদ্দতের পরেও নতুনভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ থাকে না। একে অন্যের জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যায়। এমতাবস্থায় অনুতপ্ত হওয়া এবং আপসের জন্য আগ্রহী হওয়া কোনো কাজে আসে না।

 

নারীর তালাক নেওয়ার বৈধ উপায়

ন্যায়সঙ্গত কারণে তালাক ইসলামে বৈধ। তবে এটি সবচেয়ে নিকৃষ্ট বৈধ কাজ। নারীরাও বৈধ উপায়ে এ তালাক নেওয়ার অধিকার রাখে। নারীরা যথাযথ কারণে স্বামী থেকে আলাদা হওয়ার দুইটি বৈধ উপায় আছে। নারীদের তালাক নেওয়ার কারণ দুইটি কী?

দাম্পত্য জীবনে অশান্তির কারণেই স্বামী-স্ত্রীর পরস্পর আলাদা হয়। তালাকের মাধ্যমে এ সম্পর্কের অবসান ঘটে। তবে নারীর বৈধ দুইটি কারণে স্বামীর কাছ থেকে তালাক নিতে পারে। তাহলো-

 

১. স্ত্রীকে দীর্ঘদিন দাম্পত্য অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা

বিবাহিত পুরুষদের অনেকে দীর্ঘদিন স্ত্রীকে একসঙ্গে থাকার দাম্পত্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। ইচ্ছা-অনিচ্ছায় অনেকে বছরের পর বছর দূর প্রবাসে জীবন কাটিয়ে দেয়। অনেক নারীই পারিবারিক নানা কারণে স্বামীকে ফিরে আসার দাবী করতে পারে না।

অনেক সময় দেখা যায়, স্বামী কাছে না থাকার কারণে অন্য পুরুষের প্ররোচনায় কিংবা শয়তানের ধোকায় পড়ে পরকীয়াসহ অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ স্বামীর পরিশ্রমের অর্থ অবৈধ/অনৈতিক সম্পর্কের পেছনে খরচ করে থাকে।

অথচ ইসলাম নারীকে তার ইজ্জত রক্ষায়, দাম্পত্য জীবনের শান্তি ধরে রাখতে বৈধভাবে জীবন পরিচালনার পৃথক হওয়ার অধিকার দিয়েছে। এ পরিস্থিতে চাইলে সে স্বামীর কাছ থেকে বৈধভাবেই তালাক গ্রহণ করতে পারে। যার ফলে অবৈধ সম্পর্কে খারাপ পরিণতি ও গোনাহ কিংবা দাম্পত্য জীবনের কষ্ট থেকেও মুক্তি পেতে পারে।

তাই দীর্ঘদিন দাম্পত্য অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকা নারীর জন্য রয়েছে কিছু করণীয়। যারা ধৈর্যধারণ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে অবৈধ সম্পর্কের দিকে পড়ে পরকালকে ধ্বংস করে দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাদের জন্য তালাক নেওয়ার আগে এ পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা একান্ত জরুরি। তাহলো-

> স্বামীর অবর্তমানে ধৈর্য ধারণ করতে না পারলে স্বামীকে ঘরে ফিরে আসার জন্য দাবি জানানো।

> যদি তাদের স্বামী ফিরে না আসে এবং এ কারণে সে ধৈর্যধারণ করা সম্ভব না হয়; তবে স্বামীর কাছে তালাক চাওয়া। এতে ওই নারীর স্বামী ঘরে ফিরে আসার বিষয়টির গুরুত্বসহ বুঝতে পারবে।

> স্বামী যদি ফিরে না আসে এবং তালাক দিতে রাজী না হয় তাহলে ‘মুসলিম পারিবারিক আইন’-এর আওতায় কাজীর মাধ্যমে ‘খুলা’ (তালাক) করে পৃথক হয়ে যাওয়া।

 

এ প্রসঙ্গে ফতোয়া

প্রখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত শায়খ সালিহ আল-ফাওজান হাফিজাহুল্লাহ তার একটি ফতোয়ায় উল্লেখ করেছেন, ‘যদি কোনো স্বামী তার স্ত্রীর কাছ থেকে ছয় মাসের বেশি দূরে থাকে এবং তার স্ত্রী তাকে দেশে ফিরে যেতে বলে; তখন তার জন্য ঘরে ফেরা ওয়াজিব।

স্বামী যদি তার জন্য ওয়াজিব কারণে সফরে থাকে; যেমন, তার পক্ষে ফরজ হজ করা বা ফরজ জিহাদে যোগদান করা, অথবা (কোন কারণে) ঘরে ফেরা সম্ভব নয়, তবে সেক্ষেত্রে (স্বামীর জন্য) ঘরে ফেরা আবশ্যক নয়।

স্বামী যদি বৈধ কারণ ছাড়া বাড়ি ফিরতে অস্বীকার করে এবং তার স্ত্রী খুলা (তালাক) দাবি করে, তাহলে বিচারক স্বামীর সাথে যোগাযোগ করার পর তাদের আলাদা করে দেবেন। কারণ এই ব্যক্তি (স্বামী) তার স্ত্রীকে অপরিহার্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। (আল-মুলখ-খাস আল-ফিকহী ২/২৯০)

২. স্বামী তার স্ত্রীর জৈবিক চাহিদা মেটাতে অক্ষম

যদি কোন স্বামী তার স্ত্রীর জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে না পারে বা যৌন দুর্বলতার কারণে তার সাথে মিশতে না পারে এবং স্ত্রী এই কারণে ধৈর্য ধারণ করতে না পারে, তাহলে কি করা উচিত-

স্ত্রী তার স্বামীকে এক বছর পর্যন্ত চিকিৎসা নিতে দেন। চিকিৎসার পরও যদি স্বামীর অবস্থার পরিবর্তন না হয়; যদি সে যৌনরোগ থেকে সুস্থ না হয়, তাহলে সে এমন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে কিনা তা স্ত্রী বিবেচনা করবে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে, স্বামী থাকা উপকারী কি না তা সিদ্ধান্ত নেওয়া স্ত্রীর উপর নির্ভর করে। এমতাবস্থায় মহিলাটি ধৈর্য ধরতে না পারলে স্বামী বা পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে কাজীর মাধ্যমে খুলা (তালাক) নিতে পারেন। এই অবস্থা থেকে ভুগছেন এমন সমস্ত মহিলাদের জন্য এটি বৈধ।

 

এছাড়াও অন্যান্য কারণ আছে-

> স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে না পারলে।

> সে তার স্ত্রী ব্যতীত অন্য নারীদের প্রতি আসক্ত অর্থাৎ ব্যভিচার, পাপাচার বা অনৈতিক কাজে লিপ্ত।

> কোন বৈধ কারণে স্বামীর প্রতি তীব্র বিদ্বেষ থাকলে।

> স্বামী দীর্ঘদিন বা কোথাও বন্দী থাকার ফলে স্ত্রী নিরাপত্তাহীনতা বা ক্ষতির আশঙ্কা করলে।

> ইসলামী আইন দ্বারা নির্ধারিত কোন কারণ ছাড়াই যদি কোন স্বামী তার স্ত্রীকে শারীরিক ক্ষতি, নির্যাতন, অপমান বা অভিশাপ দেয়।

> স্বামী স্ত্রীকে কোনো দুরারোগ্য বা ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে।

> স্ত্রী বাধ্য হলে প্রবাসে অভ্যস্ত হয়ে যান। অর্থাৎ স্ত্রীর মা-বাবা, ভাই-বোনসহ মাহরামের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করা।

> নামাজ, রোজা, হজ, যাকাতসহ ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি স্ত্রীকে ইসলামের বিধি-বিধান পালনে বাধা দেওয়া বা স্ত্রীকে অপমান করা।

 

মনে রাখবেন

হাদিসটি সেই সমস্ত স্ত্রীদের জন্য গুরুতর পরিণতির কথা বলে যারা বিনা কারণে তাদের স্বামীর কাছ থেকে তালাক চায়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

‘যদি কোনো নারী (স্ত্রী) অকারণে তার স্বামীর কাছ থেকে তালাক চায়, তাহলে তার জন্য জান্নাতের সুগন্ধিও হারাম হয়ে যায়।’ (আবু দাউদ)

 

শেষ কথা

বিবাহ, বিচ্ছেদ এবং দাম্পত্য জীবনের সমস্ত নিয়ম-কানুন শেখা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তালাকের মাসয়ালা ও এর পরিণতি সম্পর্কে অবগত না হয়ে কখনো তালাক শব্দটি উচ্চারণ না করা স্বামীর কর্তব্য। আর যদি তারা কোন কারণে এবং এমনভাবে তালাক দেয় যে তাদের জন্য একসাথে থাকা বৈধ নয়, তাহলে তাদের উচিত আল্লাহকে ভয় করা। বিভিন্ন অজুহাত বা ভুল কথার ভিত্তিতে বা মূল ঘটনা গোপন রেখে একসঙ্গে বসবাস করা উচিত নয়। বিয়ে শুধু সময়ের ব্যাপার নয়, জীবনের ব্যাপার। প্রকৃতপক্ষে, যদি তালাক হয়ে যায় এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈবাহিক সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় এবং স্বামী-স্ত্রী একসাথে বসবাস করে, তাহলে তা হবে মারাত্মক গুনাহ এবং উভয়েই ব্যভিচারের অপরাধী হবে।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর সকল নারীকে প্রথমে ধৈর্য ধারণ করার তাওফীক দান করুন। অথবা বিবাহিত জীবনে অবৈধ উপায় অবলম্বন না করে দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তি ও সাফল্যের জন্য বৈধভাবে পৃথক হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x
error: Content is protected !!