কুরবানী

কুরবানী শব্দটি ‘কুরবুন’ মূল ধাতু থেকে এসেছে। অর্থ হলো নৈকট্য লাভ করা, সান্নিধ্য অর্জন করা, প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করা। শরিয়তের পরিভাষায়-নির্দিষ্ট জন্তুকে একমাত্র আল্লাহ পাকের নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত নিয়মে মহান আল্লাহ পাকের নামে জবেহ করাই হলো কুরবানী। ধন-সম্পদের মোহ ও মনের পাশবিকতা দূরীকরণের মহান শিক্ষা নিয়ে প্রতি বছর আসে পবিত্র কুরবানী। ইসলাম ধর্মে কুরবানীর দিনকে ঈদুল আজহাও বলা হয়।

কুরবানী এর উদ্দেশ্য

কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন শুধু তার ইবাদত করার জন্য। তাই আল্লাহ তা‘আলার বিধান তাঁর নির্দেশিত পথে পালন করতে হবে। তিনি বলেন :

وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ

‘আমি জিন ও মানুষকে এ জন্য সৃষ্টি করেছি যে, তারা শুধু আমার ইবাদত করবে।’ [সূরা আয্যারিয়াত-৫৬]

আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে কুরবানীর বিধান আমাদের উপর আসার বেশ কিছূ উদ্দেশ্যও রয়েছে:

১. শর্তহীন আনুগত্য

আল্লাহ তা‘আলা তার বান্দাহকে যে কোনোআদেশ দেয়ার ইখতিয়ার রাখেন এবং বান্দাহ তা পালন করতে বাধ্য। তাই তার আনুগত্য হবে শর্তহীন। আল্লাহর আদেশ সহজ হোক আর কঠিন হোক তা পালন করার বিষয়ে একই মন-মানসিকতা থাকতে হবে এবং আল্লাহর হুকুম মানার বিষয়ে মায়া-মমতা প্রতিবন্ধক হতে পারে না। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর আনুগত্য ছিল শর্তহীন। এ জন্য মহান আল্লাহ যেভাবে বিশ্ব মানবমন্ডলীকে বিভিন্ন জাতিতে বিভক্ত করেছেন ঠিক সেভাবে সর্বশেষ জাতি হিসেবে মুসলিম জাতির পিতাও মনোনয়ন দিয়েছেন । কুরআনে এসেছে :

مِّلَّةَ أَبِيكُمۡ إِبۡرَٰهِيمَۚ هُوَ سَمَّىٰكُمُ ٱلۡمُسۡلِمِينَ

‘এটা তোমাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাত;তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন মুসলিম।’ [সূরা আল–হাজ্জ : ৭৮]

২. তাকওয়া অর্জন

তাকওয়া অর্জন ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় না। একজন মুসলিমের অন্যতম চাওয়া হলো আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জন। পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে কুরবানী দাতা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য অর্জন করেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

لَن يَنَالَ ٱللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَآؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ ٱلتَّقۡوَىٰ مِنكُمۡۚ كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمۡ لِتُكَبِّرُواْ ٱللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَىٰكُمۡۗ وَبَشِّرِ ٱلۡمُحۡسِنِينَ

‘আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এজন্য যে, তিনি তোমাদের পথ-প্রদর্শন করেছেন; সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন সৎকর্ম পরায়ণদেরকে। [সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭]

৩. আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা

প্রত্যেক ইবাদাতই আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে। তাই কুরবানীর মাধ্যমে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা হয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمۡ لِتُكَبِّرُواْ ٱللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَىٰكُمۡۗ وَبَشِّرِ ٱلۡمُحۡسِنِينَ

‘এভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এজন্য যে, তিনি তোমাদের পথ-প্রদর্শন করেছেন; সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন সৎকর্মপরায়ণদেরকে। [সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭]

৪. ত্যাগ করার মহান পরীক্ষা

কুরবানীর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ত্যাগ করার মানসিকতা তৈরী করা। আল্লাহর বিধান পালনে জান-মালের ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। কুরবানীর ঈদকে গোশত খাওয়ার অনুষ্ঠানে পরিণত করা নয়, বরং নিজেদের মধ্যকার পশুসুলভ আচরণ ত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। নফসের আনুগত্য ত্যাগ করে আল্লাহর একান্ত অনুগত হওয়াই কুরবানীর উদ্দেশ্য।

وَلَنَبۡلُوَنَّكُم بِشَيۡءٖ مِّنَ ٱلۡخَوۡفِ وَٱلۡجُوعِ وَنَقۡصٖ مِّنَ ٱلۡأَمۡوَٰلِ وَٱلۡأَنفُسِ وَٱلثَّمَرَٰتِۗ وَبَشِّرِ ٱلصَّٰبِرِينَ

‘আমি তোমাদেরকে অবশ্যই ভয়, দারিদ্র্য, সম্পদ ও জীবনের ক্ষয়ক্ষতি করার মাধ্যমে পরীক্ষা করবো।’ [সূরা আল-বাকারাহ: ১৫৫]

কুরবানী

 

 

কুরবানীর গুরুত্ব ও ফজিলত

কুরবানী হলো ইসলামের একটি শি’য়ার বা মহান নিদর্শন। কুরআন মাজিদে আল্লাহতায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন-‘তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও পশু কুরবানি কর।’ (সূরা কাউসার, আয়াত-২)।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে’। (ইবনে মাজাহ-৩১২৩)। যারা কুরবানি পরিত্যাগ করে তাদের প্রতি এ হাদিস একটি সতর্কবাণী।

কুরবানীর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য অর্জিত হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না উহার (জন্তুর) গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। (সূরা হাজ্জ, আয়াত-৩৭)।

কুরবানিতে গরিব মানুষের অনেক উপকার হয়। যারা বছরে একবারও গোশত খেতে পারে না, তারাও গোশত খাবার সুযোগ পায়। কুরবানির চামড়ার টাকা গরিবের মাঝে বণ্টন করার মাধ্যমে তাদের অভাব ও দুঃখ মোচন হয়। অপরদিকে কুরবানির চামড়া অর্থনীতিতে একটি বিরাট ভূমিকা পালন করে থাকে।

 

কুরবানীর ইতিহাস ও প্রচলন

পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম কুরবানি হলো মানবগোষ্ঠীর আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্রের মাঝে সংঘটিত হওয়া কুরবানি। এখান থেকেই কুরবানির প্রথম প্রচলন শুরু হয়। তবে পবিত্র ইসলামে আমরা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর স্মরণে কুরবানি করে থাকি।

এ প্রসঙ্গে ইবনে মাজাহ শরিফে এসেছে, হজরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘কতিপয় সাহাবি প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! কুরবানি কী? হজরত রাসূলে মকবুল (সা.) বললেন, তোমাদের পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নাত।’ সাহাবারা বললেন, এতে আমাদের জন্য কী প্রতিদান রয়েছে? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে।’ (ইবনে মাজাহ-৩১২৭)।

কুরবানির গুরুত্বারোপ করে আল্লাহতায়ালা বলেন, হে ইবরাহিম! স্বপ্নে দেওয়া আদেশ তুমি সত্যে পরিণত করেই ছাড়লে। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। অবশ্যই এটা ছিল একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি এক মহান কুরবানির বিনিময়ে তাকে মুক্ত করলাম। (সূরা সাফফাত, আয়াত নং ১০৪-১০৭)।

 

শরিয়তে কুরবানীর বিধান

ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আহমাদ (রহ.)-এর মতে কুরবানি ওয়াজিব। তাদের দলিল হলো-আল্লাহতায়ালা নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও পশু জবেহ কর।’ (সূরা কাওসার, আয়াত-২)।

সুতরাং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্দেশ পালন সাধারণত ফরজ বা ওয়াজিব হয়ে থাকে। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে’।

অত্র হাদিসের ভাষ্যেও কুরবানি ওয়াজিব প্রমাণিত হয়। তবে ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মতে কুরবানি করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।

 

কুরবানীর নেসাব ও তার মেয়াদ

কুরবানীর নেসাব হলো হাজাতে আসলিয়া তথা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও উপার্জনের উপকরণ ইত্যাদি ব্যতিরেকে যদি সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য কিংবা তার মূল্য বা সমমূল্যের সম্পদের মালিক হওয়া।

প্রকাশ থাকে যে, জাকাতের নেসাব যা, কুরবানির নেসাবও তা। তবে কুরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে একটু অতিরিক্ত বিষয় রয়েছে। তা হলো- অত্যাবশ্যকীয় আসবাবপত্র ব্যতীত অন্যান্য অতিরিক্ত আসবাবপত্র, সৌখিন মালপত্র, খোরাকি বাদে অতিরিক্ত জায়গা-জমি, খালিঘর বা ভাড়া ঘর (যার ভাড়ার ওপর জীবিকা নির্ভরশীল নয়) এসব কিছুর মূল্য কুরবানির নেসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া-৫/২৯২)।

জাকাত ও কুরবানীর নেসাবের সময়সীমা নিয়েও পার্থক্য রয়েছে। আর তা হলো-জাকাতের নেসাব পূর্ণ এক বছর ঘুরে আসা শর্ত; কিন্তু কুরবানির নেসাব পূর্ণ এক বছর ঘুরে আসা শর্ত নয়। কেবল জিলহজ মাসের ১০, ১১, ১২ এই তিন দিনের যে কোনো একদিন নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই কুরবানি ওয়াজিব হবে। (ফতোয়ায়ে শামি)।

 

কুরবানীর পশু ও তার বয়স

এমন পশু দ্বারা কুরবানি দিতে হবে যা শরিয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে; আর তা হলো ছয় ধরনের পশু। সেগুলো হলো- উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা।

শরিয়তের দৃষ্টিতে কুরবানির পশুর বয়সের দিকটা খেয়াল রাখা জরুরি। উট পাঁচ বছরের হতে হবে। গরু বা মহিষ দুই বছরের হতে হবে। ছাগল, ভেড়া, দুম্বা পূর্ণ এক বছরের হতে হবে। তবে যদি ছয় মাস বয়সের ভেড়া বা দুম্বা মোটাতাজায় এক বছরের মতো মনে হয়, তখন তা দিয়েও কুরবানি করা জায়েজ আছে। কিন্তু ছাগল যতই মোটাতাজা হোক, এক বছরের একদিন কম হলেও তা দিয়ে কুরবানি জায়েজ হবে না।

যেমন হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘তোমরা অবশ্যই মুসিন্না (নির্দিষ্ট বয়সের পশু) কুরবানি করবে। তবে তা তোমাদের জন্য দুষ্কর হলে ছয় মাসের মেষ-শাবক কুরবানি করতে পার’। (সহিহ মুসলিম-১৯৬৩)।

 

কুরবানীর পশুর বিধান

কুরবানীর জন্য পশু আগেই নির্ধারণ করতে হবে। নির্ধারিত পশু জবেহর আগে কোনো কাজে ব্যবহার বা তা থেকে কোনো ধরনের উপকার নেওয়া যাবে না। যেমন-দান করা, বিক্রি করা, কৃষিকাজে ব্যবহার করা, দুধ ও পশম বিক্রি করা ইত্যাদি।

কুরবানীর পশু ছাগল, ভেড়া কিংবা দুম্বা হলে একটিতে এক ভাগ এবং উট, গরু কিংবা মহিষ হলে একটিতে সাত ভাগে কুরবানি দেওয়া যাবে। গুণগত দিক দিয়ে উত্তম হলো কুরবানির পশু হৃষ্টপুষ্ট, অধিক গোশত সম্পন্ন, নিখুঁত ও দেখতে সুন্দর হওয়া। কুরবানির পশু যাবতীয় দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত হতে হবে।

কুরবানীর উদ্দেশ্যে পশু ক্রয়ের পর যদি বাচ্চা হয় বা জবেহ করার পর তার পেট থেকে বাচ্চা পাওয়া যায়, তাহলে সে ক্ষেত্রে হুকুম হলো- মায়ের সঙ্গে বাচ্চাটিকেও কুরবানি করে দিতে হবে। তবে ওই বাচ্চার গোশত নিজে খাবে না, বরং দান করবে। আর যদি বাচ্চাটি কুরবানি না করে কোনো গরিব-মিসকিনকে দান করে, তাও জায়েজ রয়েছে। (ফতোয়ায়ে আলমগিরি-৩/৩৫৪)।

 

কুরবানীর পশু জবেহর সময়

কুরবানী নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ইবাদত। কুরবানির পশু জবেহ করার সময় হলো ৩ দিন-জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ। এটাই ওলামায়ে কেরামের কাছে সর্বোত্তম মত হিসাবে প্রাধান্য পেয়েছে।

এ সময়ের আগে যেমন কুরবানি আদায় হবে না, তেমনি পরে করলেও আদায় হবে না। অবশ্য কাজা হিসাবে আদায় করলে ভিন্ন কথা। যারা ঈদের সালাত আদায় করবেন তাদের জন্য কুরবানির সময় শুরু হবে ঈদের সালাত আদায় করার পর থেকে।

যদি ঈদের সালাত আদায়ের আগে কুরবানির পশু জবেহ করা হয়, তাহলে কুরবানি আদায় হবে না। কিন্তু যে স্থানে ঈদের নামাজ বা জুমার নামাজ বৈধ নয় বা ব্যবস্থা নেই, সে স্থানে ১০ জিলহজ ফজর নামাজের পরও কুরবানি করা বৈধ হবে। (কুদুরি) আর কুরবানির শেষ সময় হলো জিলহজ মাসের ১২ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত।

 

কুরবানীর পশু হারিয়ে গেলে বিধান

যদি পশুটি হারিয়ে যায় বা চুরি হয়ে যায় বা মারা যায়, আর কুরবানিদাতা যদি বিত্তশালী হয় কিংবা তার ওপর পূর্ব থেকেই কুরবানি ওয়াজিব হয়ে থাকে; তাহলে আরেকটি পশু কুরবানি করা তার ওপর ওয়াজিব হবে। আর যদি সে গরিব হয় (কুরবানি ওয়াজিব না থাকে), তাহলে তার জন্য আরেকটি পশু কুরবানি করা ওয়াজিব নয়। কুরবানির জন্য নতুন পশু ক্রয়ের পরে যদি হারানো পশুটি পাওয়া যায়, তাহলে কুরবানিদাতা গরিব হলে দুটি পশুই কুরবানি করা ওয়াজিব হবে। আর ধনী হলে যে কোনো একটি কুরবানি করলেই তার ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। (বাদায়ে সানায়ে-৪/২১৬)।

 

যেসব পশু দিয়ে কুরবানী শুদ্ধ হয় না

ইসলামি বিধান মতে মোট ছয় ধরনের পশু দিয়ে কুরবানী করা যায়। আর তা হলো-উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা। এ পশুগুলোকে সুনির্দিষ্ট কিছু দোষ বা খুঁত থেকে মুক্ত থাকতে হবে। (কাযিখান ৩/৩৪৮)। সাধারণত পশুর যেসব শারীরিক দোষ, খুঁত বা গঠনের কারণে কুরবানি আদায় হয় না, তা হলো-

১) খোঁড়া পশু : যে পশু তিন পায়ে চলে, এক পা মাটিতে রাখতে পারে না বা ভর করতে পারে না এমন পশুর কুরবানি জায়েজ নয়।
২) রুগ্ণ ও দুর্বল পশু : এমন শুকনো দুর্বল পশু, যা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না তা দ্বারা কুরবানি করা জায়েজ নয়।
৩) দাঁত নেই এমন পশু : যে পশুর একটি দাঁতও নেই বা এত বেশি দাঁত পড়ে গেছে যে, ঘাস বা খাদ্য চিবাতে পারে না-এমন পশু দ্বারাও কুরবানি করা জায়েজ নয়।
৪) যে পশুর শিং ভেঙে বা ফেটে গেছে : যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙে গেছে, যে কারণে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে পশুর কুরবানি জায়েজ নয়।

পক্ষান্তরে যে পশুর অর্ধেক শিং বা কিছু শিং ফেটে বা ভেঙে গেছে বা শিং একেবারে উঠেইনি, সে পশু কুরবানি করা জায়েজ। ৫) কান বা লেজ কাটা পশু : যে পশুর লেজ বা কোনো কান অর্ধেক বা তারও বেশি কাটা, সে পশু কুরবানি জায়েজ নয়। আর যদি অর্ধেকের বেশি থাকে, তাহলে তার কুরবানি জায়েজ। তবে জন্মগতভাবেই যদি কান ছোট হয়, তাহলে অসুবিধা নেই। ৬) অন্ধ পশু : যে পশুর দুটি চোখই অন্ধ বা এক চোখ পুরো নষ্ট, সে পশু কুরবানি করা জায়েজ নয়।

 

কুরবানীর পশু জবেহ করার নিয়ম

কুরবানীর পশু জবেহ করার জন্য রয়েছে কিছু দিকনির্দেশনা। তবে পশু জবেহ বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য অন্তত নিুোক্ত দুটি বিষয়ের প্রতি অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে। নতুবা কুরবানির পশু জবেহ বিশুদ্ধ হবে না। বিষয় দুটি হলো-

১) জবেহ করার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলে জবেহ করা। তবে ‘বিসমিল্লাহ’-এর সঙ্গে ‘আল্লাহু আকবার’ যুক্ত করে নেওয়া মুস্তাহাব। ইচ্ছাকৃতভাবে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা পরিত্যাগ করলে জবেহকৃত পশু হারাম বলে গণ্য হবে। আর যদি ভুলবশত বিসমিল্লাহ ছেড়ে দেয়, তবে তা খাওয়া বৈধ। কোনো ব্যক্তি যদি জবেহ করার সময় জবেহকারীর ছুরি চালানোর ক্ষেত্রে সাহায্য করে, তবে তাকেও ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলতে হবে; নতুবা জবেহ শুদ্ধ হবে না।

২) জবেহ করার সময় কণ্ঠনালি, খাদ্যনালি এবং উভয় পাশের দুটি রগ অর্থাৎ মোট চারটি রগ কাটা জরুরি। কমপক্ষে তিনটি রগ যদি কাটা হয়, তবে কুরবানি বিশুদ্ধ হবে। কিন্তু যদি দুটি রগ কাটা হয়, তখন কুরবানি বিশুদ্ধ হবে না। (হিদায়া)।

 

কুরবানীর গোশতের হুকুম

কুরবানীর গোশত কুরবানিদাতা ও তার পরিবারের সদস্যরা খেতে পারবে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুস্থ, অভাবগ্রস্তকে আহার করাও’। (সূরা হজ্জ, আয়াত-২৮)।

ফোকাহায়ে কেরাম বলেছেন, কুরবানির গোশত তিন ভাগ করে একভাগ নিজেরা খাওয়া, এক ভাগ দরিদ্রদের দান করা ও এক ভাগ উপহার হিসাবে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশীদের দান করা মুস্তাহাব। কুরবানির পশুর গোশত, চামড়া, চর্বি বা অন্য কোনো কিছু বিক্রি করা জায়েজ নেই। কারণ তা আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত বস্তু। তবে চামড়া বিক্রি করা যেতে পারে, কিন্তু টাকা গরিবদের দান করতে হবে। কসাই বা অন্য কাউকে পারিশ্রমিক হিসাবে কুরবানির গোশত দেওয়া জায়েজ নয়।

যেহেতু সেটিও এক ধরনের বিনিময় যা ক্রয়-বিক্রয়ের মতো। তার পারিশ্রমিক আলাদাভাবে প্রদান করতে হবে। হাদিসে এসেছে-‘আর তা প্রস্তুতকরণে তা থেকে কিছু দেওয়া হবে না’। (সহিহ বুখারি-১৭১৬)। তবে দান বা উপহার হিসাবে কসাইকে কিছু দিলে তা নাজায়েজ হবে না।

 

কুরবানী না দিলে কি গোনাহ হবে?

কুরবানি না দিলে কী হয়? কুরবানি না দেওয়ার পরিণতিই বা কী? সক্ষম ব্যক্তি কুরবানি না করলে কি গোনাহগার হবে? এ সম্পর্কে ইসলামের দিকনির্দেশনাই বা কী? কুরবানি আত্মত্যাগের আর্থিক ও আত্মিক অন্যতম ইবাদত। এ ইবাদত প্রত্যেক হিজরি বছরের জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ সন্ধ্যা পর্যন্ত পালন করতে হয়।

‘হ্যা’ যার ওপর কুরবানী দেওয়া ওয়াজিব; ওই ব্যক্তি কুরবানী না দিলে ওয়াজিব তরকের জন্য গোনাহ হবেন। তাই পরিবারের খরচ মেটানোর পর যদি জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ নির্ধারিত পরিমাণ স্বর্ণ বা রুপা থাকে কিংবা নির্ধারিত পরিমাণ স্বর্ণ বা রুপার বাজার দর অনুযায়ী ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা থাকে ওই ব্যক্তির জন্য কুরবানি করা আবশ্যক।

সুতরাং যদি কারো কাছে কুরবানি করার মতো টাকা কিংবা সম্পদ থাকে, তবে তাকে অবশ্যই কুরবানি করতে হবে। আর যদি ওই ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি না করে, তবে ওই ব্যক্তির ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কঠোর হুশিয়ারি ঘোষণা করেছেন। হাদিসে এসেছে-

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যার সামর্থ্য আছে তবুও সে কুরবানি করল না (অর্থাৎ কুরবানি করার সংকল্প তার নেই) সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।’ (মুসনাদে আহমদ, মুসতাদরেকে হাকেম)

কুরবানী দেওয়া ওয়াজিব। আর ওয়াজিব তরক করা কবিরাহ বা বড় গোনাহ। সম্পদশালী ব্যক্তি যদি কুরবানি হুকুম পালন না করে তবে বড় গোনাহগার হবে।

তাছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানী করা থেকে বিরত থাকা ব্যক্তিকে অভিসম্পাত করে বলেন যে, সে যেন ঈদগাহে না আসে। তাই কুরবানী করার মতো টাকা বা সম্পদের মালিক ব্যক্তির জন্য কুরবানি করা ওয়াজিব। যার ওপর কুরবানি ওয়াজিব সে যেন তা পালন করার মাধ্যমে ওয়াজিব তরক করার গোনাহ থেকে নিজেকে বিরত রাখে।

 

মনে রাখা জরুরি

যাদের ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব; তারা কুরবানি দিলে অবশ্যই অনেক সাওয়াবের অধিকারী হবে। হাদিসের বর্ণনা থেকেই তা সুস্পষ্ট। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কুরবানি দেয় সে কুরবানিকৃত পশুর গায়ের পশম পরিমাণ সাওয়াব পাবে।’ এ ছাড়াও হাদিসে পাকে কুরবানি দেওয়ার আরও অনেক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।

পক্ষান্তরে যার ওপর কুরবানি ওয়াজিব নয়, কিন্তু সে ব্যক্তিও কষ্ট করে কুরবানির ব্যবস্থা করে, তাহলে সে নফল ইবাদত হিসেবে অনেক সাওয়াবের অধিকারী হবে।

নফল ইবাদত সম্পর্কে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বান্দা যত বেশি নফল ইবাদত করতে থাকে আমি তত বেশি তাকে ভালোবাসতে থাকি। ভালোবাসতে বাসতে এক সময় আমি তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শুনে, আমি তার হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে ধরে, আমি তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে চলে।’ (সুবহানাল্লাহ!)

সুতরাং মুমিন মুসলমানের উচিত, নিসাব পরিমান টাকা বা সম্পদের মালিক হলে কুরবানি করার মাধ্যমে ওয়াজিব হুকুম যথাযথভাবে পালন করার মাধ্যমে অধিক সাওয়াবের অধিকারী হওয়া। পক্ষান্তরে ওয়াজিব কুরবানি না করার গোনাহ থেকে নিজেকে বিরত রাখা।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর সব নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিককে কুরবানি করার মাধ্যমে ওয়াজিব আমল যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। কুরবানীর ফজিলত ও মর্যাদা লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x
error: Content is protected !!