হালাল উপার্জন

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার নাম। এতে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানব জীবনের সকল সমস্যা সমাধানের বর্ণনা রয়েছে। এতে মানবজাতির জন্য কী ভাল এবং কী মন্দ তা নির্দারন করে দিয়েছেন। এবং ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দেয় এবং মানবজাতিকে সমস্ত ধরণের মন্দ এবং ক্ষতিকারক জিনিসগুলির বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিল। তাই ইসলাম শান্তির বাণী নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে মানবজাতির জন্য কল্যাণের আঁধার হিসেবে। মানবদেহের প্রাণশক্তি হিসেবে রক্তের গুরুত্ব অপরিসীম, মানবজীবনে ঠিক অর্থের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তাও তদরুপ। ফলে অর্থ মানুষের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর এর জন্য প্রয়োজন মেধা, শ্রম ও সময়ের সঠিক ব্যবহার। জীবিকার এই মাধ্যমটিকে পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন নির্ধারিত ইবাদত (যেমন নামাজ) শেষ করে জীবিকার সন্ধানে ছড়িয়ে পড়তে। যাতে সর্বশ্রেষ্ঠ সত্ত্বা জীবিকা উপার্জনে একজন নবীন হয়ে ওঠে। মহানবী (সা.) তার কষ্টার্জিত অর্থকে সর্বোত্তম উপার্জন বলে বর্ণনা করেছেন। তবে অবশ্যই উপার্জনের পথ অবশ্যই শরীয়ত নির্দেশিত পথে হতে হবে। ইসলাম এ ধরনের উপার্জনকে অবৈধ ঘোষণা করেছে, যাতে রয়েছে প্রতারণা, মিথ্যা, ধোঁকাবাজি, মানুষের দুঃখ-দুর্দশা এবং সর্বোপরি জুলুম। অবৈধ উপায়ে দুনিয়াতে উপার্জন করে সুখ পেলেও পরকালে এর জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার রয়েছে। এ লক্ষ্যে ইসলাম হালাল উপার্জনকে অপরিসীম গুরুত্ব দিয়েছে। নিম্নে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

 

হালাল উপার্জন মানে বৈধ উপার্জন। হালাল উপার্জন হল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক নির্দেশিত ও অনুমোদিত পদ্ধতিতে অর্জিত আয়; হালাল উপার্জন সবার জন্য উত্তম। হালাল উপার্জন থেকে জীবিকা নির্বাহ করা ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন শুধুমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য। ইবাদত যেমন ফরজ, তেমনি হালাল উপার্জন বা হালাল রুজি। আল্লাহর হুকুম হল: সালাত শেষ হলে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ কর, তথা উপার্জন কর (সূরা জুমুআ-১০)।

ইসলাম হালাল উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহের নির্দেশ দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: “হে ঈমানদারগণ! একে অপরের সম্পদ অবৈধভাবে গ্রাস করো না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হালাল রুজি অন্বেষণ করা ফরজের পরও একটি ফরজ (বায়হাকি)।

ইসলামে মৌলিক ইবাদত গ্রহণের জন্য হালাল রুজি একটি পূর্বশর্ত। যাদের রুজি হালাল নয় তাদের সকল প্রকার নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত কবুল হবে না। তাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দুই হাতের উপার্জিত হালাল খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য আর নেই (বুখারি)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন যে, যে ব্যক্তি হালাল খাবার দিয়ে নিজের এবং তার পরিবারের ভরণপোষণের চেষ্টা করে সে আল্লাহর পথে একজন মুজাহিদের মতো।

 

হালাল উপার্জনের জন্য মানুষকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়। বসে বসে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করতে তেমন কষ্ট করতে হবে না; কিন্তু হালাল উপার্জন করতে হলে অনেক সময়, শ্রম ও মেধা ব্যয় করতে হয়। এতে মানুষের উদাসীনতা দূর হয়। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ফজরের নামায আদায় করে, রিযিক না চাওয়া ছাড়া ঘুমিয়ে পড়বে না। বিখ্যাত সাহাবী হজরত ওমর (রা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন জীবিকার সন্ধানে অলসভাবে বসে না থাকে। পৃথিবীতে যত নবী-রাসুল এসেছেন তারা নিজ হাতে হালাল উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। তাই হালাল উপার্জন সকল নবী-রাসুলদের সর্বজনীন সুন্নাত।

হালাল উপার্জন

 

হালাল উপার্জন

সর্বশক্তিমান আল্লাহ মানবজাতিসহ অগণিত সৃষ্ট বস্তুর জন্য রিজিক প্রদান করেছেন, সকলের জন্য রিজিক নির্ধারণ করেছেন। তবে যারা হারাম খাবার খান তাদের হালাল খাবারের পরিমাণ কমে যায়। ঈমান রক্ষার জন্য হালাল খাবার খাওয়া অপরিহার্য। হালাল উপার্জনের মাধ্যমে গৃহীত খাবার খেয়ে কেউ নেক আমল করলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়। হারাম রিজিক খেয়ে ঈমান ও আমল নষ্ট হয়। এজন্য মহান আল্লাহ আমাদেরকে হালাল খাবার খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। হালাল খাবার গ্রহণের গুরুত্ব নিচে তুলে ধরা হলো:

 

বৈধ রিজিক তালাশের নির্দেশ

বৈধ রিজিকের সন্ধান করা ফরজ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন নামায শেষ হবে, তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণ করবে এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করবে, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার’ (সূরা: জুমুআ, আয়াত: ১০)। এ আয়াতে মহান আল্লাহ নামাজ শেষ করে হালাল রিজিক অন্বেষণের নির্দেশ দিয়েছেন। হালাল রিজিক খোঁজার একটি উপায় হল ব্যবসা করা। আল্লাহতায়ালা সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবসা করাকে হালাল ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)

 

 

নবীদের হালাল রিজিক গ্রহণের নির্দেশ

পবিত্র কুরআন নবীদেরকে হালাল রিযিক অন্বেষণের নির্দেশ দিয়ে বলে, ‘হে রসূলগণ, তোমরা পবিত্র বস্তু থেকে আহার কর এবং সৎকাজ কর। তোমরা যা কর আমি সে সম্পর্কে অবগত। (সূরা মুমিনুন, আয়াত: ৫১)

 

হালাল ব্যবসায় মানুষের বেশির ভাগ রিজিক

ইমাম গাজালি (রহ.) বর্ণনা করেন, ‘তোমরা ব্যবসা-বাণিজ্য করো। কেননা, তাতে ৯-দশমাংশ জীবিকা আছে।’ (ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৬৪)

 

সত্যবাদী ব্যবসায়ীর জন্য সুসংবাদ

মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমানতদার সত্যবাদী ব্যবসায়ী পরকালে নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গী হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস নম্বর : ১২০৯)

 

নবীরা হালাল উপার্জন করতেন

ইমাম বুখারী (রহঃ) বর্ণনা করেন, আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, প্রত্যেক নবীই ছাগল চরাতেন। সাহাবীরা বললেন, আপনিও কি তাই করতেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি কয়েক কিরাআত (আরবের পরিমাপ বিশেষ) মক্কার ছাগল চরিয়েছি।

মিকদাদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাবার খায় না। আর নিশ্চয়ই আল্লাহর নবী দাউদ (আঃ) নিজের হাতের উপার্জন থেকে খেতেন। (বুখারি, হাদিস নম্বর: ২০৭২)

 

ভূমির মালিককে চাষ করার নির্দেশ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যার জমি আছে সে নিজেই তার জমি চাষ করবে।’ (বুখারি, হাদিস নম্বর : ২৩৪০)

অন্য হাদিসে এসেছে, আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যেকোনো মুসলিম কোনো গাছ রোপণ করবে বা ক্ষেত-খামার করবে তার থেকে যদি কোনো পাখি বা মানুষ বা কোন প্রাণী খায় তা দ্বারা সে সদকার পুণ্য পাবে।’ (বুখারি, হাদিস নম্বর : ২৩২০)

 

হারাম রিজিক বর্জনের নির্দেশ

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘হে লোক সকল, আল্লাহকে ভয় কর এবং সুন্দরভাবে তাঁর ইবাদত কর। কেননা, কোন আত্মা তার রিজিক পূর্ণ না করে মৃত্যুবরণ করবে না – যদিও তা বিলম্বিত হয়। তাই আল্লাহকে ভয় কর এবং তাকে সুন্দর উপায়ে তালাশ কর। যা হালাল তা গ্রহণ করুন এবং যা হারাম তা বর্জন করুন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২১৪৪)

 

 

হারাম গ্রহণ করলে হালাল রিজিক কমে যায়

আসবাহনী (রহ.) ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হিলয়াতুল আউলিয়া গ্রন্থে লিখেছেন যে, যে কোন মুমিন বা সীমালঙ্ঘনকারীর রিযিক আল্লাহর কাছে বৈধভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। রিযিক না আসা পর্যন্ত সে ধৈর্য ধারণ করলে আল্লাহ তাকে তা দান করবেন। আর যদি সে অধৈর্য হয়ে হারাম খাবার খায়, আল্লাহ তার হালাল রিযিক থেকে তা কমিয়ে দেবেন। ‘

 

 

হালাল উপার্জন জান্নাতে প্রবেশের কারণ

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি হালাল খাদ্য খায় এবং সুন্নাত পালন করে এবং ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তখন এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসুল, এখন এমন অনেক লোক আছে। তিনি বললেন, আমার পরে কয়েক যুগেই পাওয়া যাবে। (তিরমিযী, হাদিস : 2520)

অন্য হাদীসে জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নুমান বিন কাউকাল (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর দরবারে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি বলেন, যদি আমি ফরজ নামায পড়ি, হারামকে হারাম মনে করি এবং হালালকে হালাল মনে করি – আমি কি জান্নাতে যাব? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ যাবে। (মুসলিম, হাদিস: ১৫)

 

হালাল জীবিকা তালাশ করা ফরজ

নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, ‘হালাল রিজিক তালাশ করা অন্য ফরজের পরে ফরজ।’ (আল মুজামুল কবির, হাদিস : ৯৯৯৩)

হালাল উপার্জন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হালাল ব্যতীত অন্য কোন উপায়ে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ দ্বারা যে দেহ বা প্রজন্ম গড়ে উঠবে তা হবে জাহান্নামের ইন্ধন। তাতে কারোর দুনিয়ার জীবন নষ্ট হবে, কারো সংসার জীবন নষ্ট হবে-আখেরাতে শাস্তি তো আছেই। তাই সবাইকে হালাল উপার্জনে আত্মনিয়োগ করতে হবে। মোটকথা, হালাল খাদ্য অন্বেষণ করা প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য। হারাম রিজিক গ্রহন করলে পরকালে অবশ্যই এর জবাব দিতে হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে উত্তম রিজিকের জন্য কবুল করুন। আমিন।।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x
error: Content is protected !!