আকিকার নিয়ম

সুন্নত কাজের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে আকিকা। আকিকা একটি শিশুর অধিকার। আকিকা নবজাতক শিশুর জন্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এর গুণাবলী বিশদভাবে বর্ণনা করা যায় না। আকিকার ফজিলতের বরকতে নবজাতক সন্তানের বিপদ-আপদ দূর হয়। নবজাতক শিশুর প্রতি কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে বাবা-মাকে সন্তানের জন্য দোয়া করতে হবে। এক্ষেত্রে সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে, উভয়ের জন্যই আকিকা করতে হবে। আজ আমরা এখানে আকিকার নিয়ম সম্পর্কে পূর্নাঙ্গ একটা ধারনা দেওয়ার চেষ্টা করবো, বিস্তারিত জানার জন্য আমাদের সাথেই থাকুন।

আকিকার নিয়ম

 

আকিকার নিয়ম

আকিকার সময়

আকিকা করার সর্বোত্তম সময় হল সন্তান প্রসবের সপ্তম দিন। আপনি যদি সপ্তম দিনে আকিকা দিতে না পারেন, ১৪তম দিনে, আপনি যদি তাও না করতে পারেন তবে আপনি ২১তম দিনে অবশ্যই আকিকা দেবেন। সপ্তম দিনে সন্তানের সুন্দর নাম রাখা, মাথার চুল মুণ্ডন করা এবং চুলের ওজনের সমান রৌপ্য চাদকা করা বাঞ্ছনীয়। (তিরমিযী) বিনা কারণে আকিকা দিতে বিলম্ব করা সুন্নাতের বিরোধিতা করার সামিল। যদি দারিদ্র্য বা অন্য কোনো কারণে উল্লেখিত দিনগুলোতে আকিকা করতে না পারেন, তাহলে শিশুর ছোট থাকা অবস্থায় যখনই অভাব দূর হবে তখনই আকিকা করতে হবে। যদি কোন ব্যক্তি অর্থের অভাবে তার সন্তানদের জন্য আকিকা করতে অক্ষম হয়, তবে সন্তান বড় হওয়ার পর যদি তার আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়, তাহলে সে আকিকা করলেও সুন্নত পূর্ণ হবে এবং পিতা-মাতার বরকত হবে, ইনশাআল্লাহ। পিতা-মাতা আকিকা না করলেও, বড় হওয়ার পর আকিকা করলেও তার সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত,

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াত লাভের পর নিজের আকিকা নিজে করেছেন”। (বায়হাকী) এ হাদীস থেকে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় যে, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নিজের আকিকা নিজে করা জায়েয আছে।

আকিকা কি ধরনের পশু ‍দিয়ে করা উচিত? এর সংখ্যা কত?

আকিকার ক্ষেত্রে ছেলে হলে দুটি ভেড়া বা ছাগল দিয়ে আকীকা করা সুন্নাত এবং মেয়ে হলে একটি ভেড়া বা ছাগল দিয়ে আকীকা করা সুন্নাত। কেননা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ছেলের পক্ষ থেকে সমবয়সী দুটি ছাগল এবং মেয়ে শিশুর পক্ষ থেকে একটি ছাগল দিয়ে আকিকা দিতে হবে। (আহমদ ও তিরমিযী) কুরবানীর জন্য বৈধ ছাগল বা দুম্বার ধরন ও বয়স দিয়ে আকিকা করতে হবে। অর্থাৎ কোরবানির পশুকে সকল দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত হতে হবে, আকিকার ছাগল-খাসি বা দুম্বাকেও তার সকল দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত হতে হবে।যদি ছেলে সন্তানের পক্ষ থেকে দুটি ছাগল দিয়ে আকিকা দিতে না পারে। অর্থাৎ আর্থিক অসুবিধা হলে একটি ছাগল ‍দিয়েও আকিকা করা জায়েয আছে।কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত যে, ছেলে সন্তানের পক্ষ থেকে একটি দুম্বা দিয়েও আকিকা করা হয়েছিল।

 

ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত,

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হুসাইনের পক্ষ থেকে একটি দুম্বা আকিকা করেছিলেন। (আবু দাউদ) তবে সামর্থবান ব্যক্তির পক্ষে একটি ছাগল দিয়ে ছেলে সন্তানের আকীকা করা উচিৎ নয়। মোট কথা, ছেলে সন্তানের আকীকার জন্য দু‘টি ছাগল বা দুম্বা হওয়া জরুরী নয়; বরং মুস্তাহাব।

আকিকা পশু ও সংখ্যা: উট, গরু, মহিষ, ভেড়া বা ছাগল দিয়ে আকিকা করতে হবে। কোরবানির পশুর মতো আকিকার পশুও হতে হবে সুস্থ, সবল ও ত্রুটিহীন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদেরকে ছেলের জন্য সমবয়সী দুটি ছাগল এবং একটি মেয়ের জন্য একটি ছাগল দিয়ে আকিকা করার নির্দেশ দিয়েছেন। (তিরমিযী শরীফ)

 

আকিকা মাংস বিতরণের নিয়ম

আকীকার গোশত কুরবানীর গোশতের মত। নিজে খাবে, আত্মীয়-স্বজনকে খাওয়াবে এবং গরীবদের ছাদকা দেবে। তবে কোরবানীর গোশতকে যেমন তিন ভাগে ভাগ করা জরুরী নয়, এক ভাগ নিজে খেতে হবে, এক ভাগ ছদকা এবং এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনকে উপহার হিসেবে দিতে হবে। আকিকার গোশতকে সেই নিয়ম অনুযায়ী তিন ভাগে ভাগ করা। আকিকার গোশত যদি সম্পূর্ণভাবে রান্না করে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং অন্যান্য মুসলমানদের তা খাওয়ার জন্য দাওয়াত করে তবেই যথেষ্ট হবে। তবে এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যে উপহার ও উপহারের আশায় শুধুমাত্র ধনী ও সম্মানিত ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের প্রত্যাখ্যান না করা হয়। যা আমাদের দেশের অধিকাংশ সমাজে বিয়ে বা অন্যান্য অনুষ্ঠানে হয়ে থাকে। তবে কিছু লোক সন্তানের জন্মদিনে যে অনুষ্ঠান করে বা প্রতি বছর শিশুর জন্মদিন পালন করে এবং এ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান করে তা সম্পূর্ণ বিদআত। এ বিষয়ে ইসলামী শরীয়তে কোনো দলিল নেই।

নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“যে কেউ আমাদের ধর্মে এমন কিছু সৃষ্টি করেছে, যা আমাদের ধর্মের অংশ নয় তাকে প্রত্যাখ্যান করা।” (বুখারী) এটি শুধু বিদআত নয়, অমুসলিম ইহুদি-খ্রিস্টানদের অনুসরণও বটে।

নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন,
“যে ব্যক্তি কোন জাতির অনুস্মরন করবে, সে উক্ত জাতির অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে। (আবু দাউদ)

আকিকার গোশত খাওয়া: আকিকার গোশত খেতে কারো কোন বাধা নেই। আকিকার গোশত নিজেরা খেতে পারবে। অন্যদেরও খাওয়ানো যেতে পারে।

গরু দিয়ে আকিকা

গরু দিয়ে আকিকা করার কোন হাদীস নেই। অথচ রাসূল (সা.)-এর যুগে সব ধরনের প্রাণীর অস্তিত্ব ছিল। তাই ছাগল বা দুম্বা দিয়ে আকিকা করা উত্তম। একদল আলেমদের মতে, গরু দিয়ে আকিকা করা জায়েয হবে। তবে শর্ত হলো, গরুর সাথে আকিকাকে সন্তানের পাশে থাকতে হবে। পক্ষান্তরে কোন কোন আলেম বলেছেন, সাত সন্তানের পক্ষ থেকে গরু দিয়ে আকিকা দেয়া জায়েয হবে। তবে সাত সন্তানের পক্ষ থেকে গরুর আকিকা হওয়ার কথা হাদীসে পাওয়া যায় না। যেহেতু আকিকা একটি ইবাদত, সেহেতু তা হাদিসে বর্ণিত ইবাদত অনুযায়ী করা উচিত। এবং এটা মোটেই কঠিন কিছু নয়।

 

কুরবানীর অংশে আকিকা দেওয়া

আমাদের দেশে সাতভাগে গরু দিয়ে কুরবানী করার ক্ষেত্রে আকীকার অংশীদার হওয়ার নিয়ম ব্যপকভাবে প্রচলিত আছে। এটি হাদীছ সম্মত নয়। একটি গরু দিয়ে যদি একজন সন্তানের আকীকা করা যদি ঠিক না হয়, তাহলে কুরবানীর গরুর সাথে ভাগে আকীকা করা সঠিক হওয়ার প্রশ্নই আসে না। সর্বোপরি, কিছু আলেম বলেছেন যে, কুরবানীর গরুর সাথে আকিকা ভাগ করা বৈধ হবে। কিন্তু তা হাদীসের সাথে একমত নয়।

 

আকিকা সম্পর্কে কিছু ভ্রান্ত ধারণা

কিছু লোক বিশ্বাস করে যে, শিশুর পিতা-মাতা এবং যে সন্তানকে আকিকা দেওয়া হয় তারা আকীকার গোশত খেতে পারে না। এটি একটি ভ্রান্ত বিশ্বাস। এই প্রভাবের কোন প্রমাণ নেই। আগেই বলা হয়েছে, আকিকার গোশত কুরবানীর গোশতের মতো। পরিবারের সবাই খেতে পারবে।

 

আকিকা দিতে অক্ষম হলে

আগেই বলা হয়েছে যে, দারিদ্র্যের কারণে আকিকা দিতে না পারলে আর্থিক অবস্থার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। যখনই পারবে এটা সম্পূর্ণ করে নিবে। আর যদি আর্থিক অবস্থার উন্নতি না হয় এবং আকিকা দিতে না পারে তাহলে কোন গুনাহ হবে না।

আল্লাহ তা‘য়ালা বলেনঃ

لايكلف الله نفسا إلاوسعها

“আল্লাহ তা‘য়ালা কারও উপর সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেননা। (সূরা বাকারা-২৮৬)

আল্লাহ তা‘য়ালা আরও বলেনঃ

(وما جعل عليكم فى الدين من حرج)

“আল্লাহ তা‘য়ালা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠিন বিষয় চাপিয়ে দেননি। (সূরা হজ্জঃ৭৮)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেনঃ

(فاتقوا الله ما استطعتم)

“তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তোমাদের সাধ্য অনুযায়ী”। (সূরা তাগাবুন-১৬)

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

إذاأمرتكم بأمر فأتوا منه ما استطعتم وإذا نهيتكم عن شيئ فاجتنبوه

“যখন আমি তোমাকে কিছু করতে আদেশ করি, তখন যতটা পারো তা করো। আর যখন আমি তোমাদেরকে কোন কাজ করতে নিষেধ করি তখন তা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকো।

“উপরের দলিল থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, অক্ষমতার কারণে আকিকাসহ কোনো আমল করতে না পারা কোনো গুনাহ নেই। কিন্তু হারামের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সকল নিষেধ সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে। কারণ নিষেধাজ্ঞা বা আর্থিক স্বচ্ছলতা থেকে বিরত থাকতে কোন অসুবিধা নেই।

আকিকা পশুর চামড়া: বাজারে আকিকা পশুর চামড়া বিক্রি করে বিক্রির টাকা গরীব-দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে।

 

আকিকার উপকারিতা

নবজাতক সন্তানের পিতা-মাতার উদারতা আকিকার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। গরীব, এতিম ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে গোশত বিতরণের মাধ্যমে আত্মীয়তার হক আদায় করা হয়। নবজাতক শিশুর জন্য সবাই দোয়া করবেন। আকিকাকে নতুন জীবন দান করার ফলে, আল্লাহ তায়ালা নবজাতকের উপর আসা সমস্ত বিপদ আপদ দূর করে দেন।

আকিকার কুসংস্কার

আকিকা পশুর মূল্য তার দাদার বাড়ি থেকে দিতে হয়। আকিকার গোশত পিতা-মাতা, দাদা-দাদী ও নানা-নানী খেতে পারবে না। শিশুর চুল কামানোর সময় মাথার তালুতে ক্ষুর রাখতে হবে এবং আকিকা পশু জবাই করতে হবে। কুসংস্কার থেকে দূরে থাকতে হবে। নবজাতকের কল্যাণে আকিকা করা হয়। তাই আকিকা অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে অশ্লীল নাচ-গান করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

 

পরিশেষ

শিশুর নামকরণের সাথে আকিকা সম্পর্ক রয়েছে। আকিকার সঙ্গে সন্তানের দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। আকিকা প্রথম চুল কাটার সাথে সম্পর্ক আছে। তাই আকিকা দ্রুত সম্পন্ন করা অপরিহার্য যদি আপনার সামর্থ্য থাকে। উক্ত আলোচনায় আমরা চেষ্টা করেছি আকিকার নিয়ম সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারনা দেওয়ার, আপনাদের কেমন লেগেছে আকিকার নিয়ম সমূহ জেনে তা নিন্মের কমেন্টস বক্সে কমেন্টস করে জানাবেন। আল্লাহ আমাদের মঙ্গল করুন। আমীন।

2 Comments to “আকিকার নিয়ম”

  1. জি ভালো লিখেছেন ইনশাআল্লাহ খুব শিগগিরই আকিকা দেয়ার ইচ্ছা আছে আল্লাহ কবুল করুক(আমিন).

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x
error: Content is protected !!