রিজিক বৃদ্ধির দোয়া

মানুষের জীবনে রিজিক আল্লাহর পক্ষ থেকে অনেক বড় নেয়ামত। আর এই রিজিক বৃদ্ধির জন্য ইসলামিক কিছু নিয়ম বা পদ্ধতি আছে। আজ আমরা এই অধ্যায়ে রিজিক বৃদ্ধির দোয়া সম্পর্কে পূর্নাঙ্গ একটা ধারনা দেওয়ার চেষ্টা করবো। মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করলে আশা করি উপকৃত হতে পারবেন। ইনশা আল্লাহ।।

রিজিক বৃদ্ধির দোয়া

রিজিক বৃদ্ধির দোয়া

اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বি লা ইলাহা ইল্লা আনতা খালাক্কতানি ওয়া আনা আবদুকা ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়াদিকা মাসতাতাতু আউজুবিকা মিন শাররি মা সানাতু আবুউলাকা বিনি’মাতিকা আলাইয়্যা ওয়া আবুউলাকা বিজাম্বি ফাগফিরলি ফা-ইন্নাহু লা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা।

অর্থঃ হে আল্লাহ! তুমি আমার প্রভু তুমি ছাড়া কোন উপাস্য নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনার বান্দা। আমি যতটা সম্ভব আপনার সাথে প্রতিশ্রুতি এবং প্রতিশ্রুতিতে আছি। আমি আমার সমস্ত কাজের অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আপনি আমাকে যে নেয়ামত দিয়েছেন তা আমি স্বীকার করছি। এবং আমি আমার পাপ স্বীকার করি। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন কারণ আপনি ছাড়া কেউ পাপ ক্ষমা করতে পারে না।

 

১. তওবা-ইস্তিগফার করা

তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করলে বান্দার রিযিক বৃদ্ধি পায়। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন, ‘আমি তাদের বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দান করবেন এবং তোমাদেরকে বাগবাগিচা এবং নদীনালা দান করবেন। (সুরা নুহ, আয়াত: ১০-১২; সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৮২)

ইবনে আব্বাস (রা.) এর বর্ণনায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সর্বদা তওবা করে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে; আল্লাহ সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করবেন; সমস্ত উদ্বেগ দূর করবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ১,৫১৮; ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩,৮১৯; মুস্তাদরাকে হাকেম, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৯১, হাদিস: ৭,৬৭৭)

২. পরহেজগারি অবলম্বন এবং আল্লার ওপর ভরসা রাখা

যেসব কাজকর্ম বা আমলে রিজিকে প্রবৃদ্ধি ঘটে; তার মধ্যে তাকওয়া-পরহেজগারি অবলম্বন করা এবং তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর প্রতি ভরসা রাখা অন্যতম। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর তাকওয়া অর্জন করবে, আল্লাহ তার জন্য পথ তৈরি করে দেবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দান করবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না।’ (সূরা সাদ, আয়াত: ৩৫)

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, যদি তুমি আল্লাহর উপর সঠিকভাবে ভরসা কর। তিনি পাখিদের জন্য যেমন রিজিক দান করেন, তেমনি তিনি তোমাদেরও রিযিক দেবেন। পাখিরা সকালে ক্ষুধার্ত অবস্থায় (খালি পেটে) বাসা ছেড়ে বের হয় এবং সন্ধ্যায় পেট ভরে বাড়ি ফিরে আসে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২,৩৪৪; ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪,১৬৪)

 

৩. হজ-ওমরাহ পালন

বারবার হজ ও ওমরাহ করলে রিজিক বাড়ে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিয়মিত হজ ও ওমরাহ পালন কর, কেননা এর দ্বারা কামনা-বাসনা ও গুনাহ দূর হয়ে যায়; যেমন কামারের হাপর লোহা, সোনা ও রূপা থেকে ময়লা দূর করে। .’ (তিরমিজি, হাদিস: ৮১০; নাসায়ি, হাদিস: ২,৬৩১)

 

৪. হিজরত করা এবং জিহাদে অংশ নেওয়া

আল্লাহর পথে হিজরত ও জিহাদে অংশগ্রহণ করেও রিজিকে বরকত হয়। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন, ‘আর যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর পথে হিজরত করে; সে জমিনে অনেক আশ্রয় ও সম্পদ পাবে।’ (সূরা নিসা, আয়াত: ১০০)

ইবনে উমর (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, আমার রিযিক আমার বর্শার ছায়ার নিচে রাখা হয়েছে। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৫৬৬৭; বায়হাকী, হাদিস: ১১৫৪)

 

৫. সময়মতো নামাজ আদায় এবং ইবাদতের জন্য নিজেকে মুক্ত করা

সময়মত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লে রিজিক বাড়ে। নামাজের মাঝে কাজ ও ব্যবসা করতে হবে; কাজ এবং ব্যবসার মধ্যে কোন প্রার্থনা নেই। সেই সাথে আল্লাহর ইবাদতে নিজেকে ঝামেলা থেকে মুক্ত করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘এবং তোমার পরিবার-পরিজনকে নামায পড়ার নির্দেশ দাও এবং নিজেও তাতে অবিচল থাকো। আমি তোমার কাছে কোন রিজিক চাই না। আমি তোমাকে রিজিক দেই। এবং মুত্তাকিদের জন্য এটি একটি শুভ পরিণতি।’ (সূরা ত্বহা, আয়াত: ১৩২)

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “হে আদম সন্তান! আমার ইবাদতের জন্য তুমি তোমার হৃদয় খালি করে দাও। আমি তোমার হৃদয়ের অভাব পূরণ করব এবং তোমার দারিদ্র্যের পথ দূর করব। এবং যদি আপনি না করেন; আমি তোমার হাত (দুনিয়ার) ব্যস্ততায় ভরে দেব এবং তোমার অভাব পূরণ করব না।’ (তিরমিজি, হাদিস–২,৪৬৬; ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪,১০৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৮,৬৯৬)

 

৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা

জীবিকা বৃদ্ধির আরেকটি কাজ হল আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখা। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে আমাদের আত্মীয়-স্বজনের সাথে ভালো ব্যবহার করার এবং তাদের হক যথাযথভাবে পালন করার নির্দেশ দিয়েছেন। (সূরা নিসা, আয়াত: ৩৬; সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৬)

আনাস ইবনু মালেক (রাঃ) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি চায় তার রিযিক বৃদ্ধি হোক এবং তার আয়ু দীর্ঘ হোক, সে যেন তার আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।’ (বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৫; মুসলিম, হাদিস: ৪৬৩৯)

 

৭. আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় এবং দান-সদকা করা

দানের মাধ্যমে রিজিক বৃদ্ধি পায়। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন, ‘আর যা কিছু তোমরা আল্লাহর জন্য ব্যয় করবে; তিনি এর জন্য অর্থ প্রদান করবেন। তিনিই সর্বোত্তম রিযিকদাতা।’ (সূরা সাবা, আয়াত: ৩৯)

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “প্রতিদিন সকালে দু’জন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ! দাতাকে তার দান-খয়রাতের জন্য উত্তম প্রতিদান দিন। অন্যজন বলেন, হে আল্লাহ! কৃপণকে ধ্বংস করুন।’ (বুখারি, হাদিস: ১৪৪২, মুসলিম, হাদিস: ১০১০)

 

৮. শোকর আদায় বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ

রিযিক বৃদ্ধি করে এমন একটি কাজ বা কাজ হল আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতের শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। কারণ, শুকরিয়া নিয়ামত বৃদ্ধি করে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, আমি অবশ্যই তোমাদের (নিয়ামত) বৃদ্ধি করব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি কঠোর।’ (সূরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৭)

 

৯. বিয়ে করা

আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত এবং তোমাদের দাসদের মধ্যে যারা নেককার তাদের বিয়ে কর। যদি তারা নিঃস্ব হয়, তাহলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের সম্পদশালী করবেন। কারণ আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও সর্বজ্ঞ।’ (সূরা নূর, আয়াত: ৩২)

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তিন শ্রেণীর মানুষকে সাহায্য করাকে তার দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তিনটি বিভাগের মধ্যে একটি হল, যিনি বিয়ে করতে ইচ্ছুক এবং পবিত্র জীবনযাপন করতে ইচ্ছুক।’ (তিরমিযী, হাদিস: ১৬৫৫; ইবনে মাজা, হাদিস: ২৫১৮)

 

১০. গরিব-অসহায়ের প্রতি সদয় হওয়া

রিজিক বাড়ায় এমন একটি কাজ বা অভ্যাস হল দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি সদয় হওয়া। গরীব অসহায় মানুষকে রাস্তায় হাত তুলতে দেখলে সবাইকে এক পাল্লায় মাপতে হবে এবং খারাপ আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “তাদের (ধনীদের) সম্পদে অধিকার আছে প্রত্যাশীদের (দরিদ্র) এবং বঞ্চিতদের।” (সূরা জারিয়াত, আয়াত ১৯)

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, “তোমাদের মধ্যে দুর্বলদের কারণে তোমাদের সাহায্য করা হয় এবং রিযিক দেওয়া হয়।” (বুখারি, হাদিস : ২৮৯৬)

 

১১. আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা

রিযিক বৃদ্ধি করে এমন একটি কাজ হল আল্লাহর কাছে দোয়া করা। কারণ, আমরা এমন একজন সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি- যে আপনি চাইলে খুশি; আপনি না চাইলে অখুশি। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন, ‘তোমাদের রব বলেন, আমাকে ডাক; আমি তোমার ডাকে সাড়া দেব।’ (সূরা মুমিন, আয়াত: ৬০)

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অভাবের মধ্যে পড়ে মানুষের কাছে আত্মসমর্পণ করে, অর্থাৎ অভাব দূর করার জন্য মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়; তার অভাব পূরণ হয় না। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি অভাবগ্রস্ত হয়ে প্রতিকারের জন্য আল্লাহর (দোয়া) উপর নির্ভর করে, আল্লাহ তাকে অবিলম্বে বা পরে রিজিক দান করেন।” (তিরমিযী, হাদিস:২৮৯৬ এবং ২৩২৬; মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৪২১৯)

 

১২. রিজিক অর্জনের চেষ্টায় থাকা

আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘অতঃপর নামাজ শেষ হলে তোমরা পৃথিবীতে (ভূমিতে) ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (রিযিক) অন্বেষণ কর এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর; যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সূরা জুমা, আয়াত: ১০)

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, তোমাদের কেউ যদি সকালে দড়ি নিয়ে পাহাড়ে বের হয়। তারপর কাঠ সংগ্রহ করে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং দানও করেন। মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে তার জন্য এটা অনেক ভালো।’ (বুখারি, হাদিস: ১৪৮০; মুসলিম, হাদিস: ১০৪২)

 

পরিশেষে বলতে পরি যে, রিজিক বৃদ্ধির দোয়া সম্পর্কে যদি উক্ত আলোচনা কেউ মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করে আশা করি উপকৃত হবেন। রিজিক বৃদ্ধির দোয়া প্রবন্ধটি পড়ে বেশি বেশি শেয়ার করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x
error: Content is protected !!